ঢাকা বুধবার, ২২শে মে, ২০১৯ ইং, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
basic-bank
ADD
শিরোনাম :

রোম সাম্রাজ্যের নিষ্ঠুর নারী শাসকদের গল্প

প্রাচীন রোম হচ্ছে ইতিহাসের এক ভাণ্ডার। তাই রোম সভ্যতার খুঁটিনাটি নিয়ে এখনও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। যদিও ইতালির পথে পথেই খচিত রয়েছে নানা সময়ের রঙ্গিন এবং সাদাকালো ইতিহাস। বিশেষ করে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের শাসন এবং শাসকদের দৌরাত্ম্য ছিল ব্যাপক। হোক সেটা পুরুষ বা নারী শাসক। তাদের শাসনামলে পুরো পৃথিবীর মানুষরাই ছিল এক রকম তটস্থ। আজও চলছে তাদের সেই দয়ামায়াহীন মনমানসিকতার অধ্যায়। তবে প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের কল্যাণে হয়তো তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। প্রাচীন রোমেই শুধু নয় সারা বিশ্বেই নারীদের সেভাবে কেউ মূল্যায়ন করেনি। প্রকাশ তো দূরে থাক, শ্রদ্ধার আসনেও দূর অতীতে কোথাও কেউ নারীদের জায়গা রাখেনি। শুধু পুরুষের জয়গান গেয়েছে রোমবাসীরা। বিস্ময়কর হলো এতকিছুর পরও রোমের নারীরা কখনোই পিছিয়ে ছিল না পুরুষের চেয়ে। অধিকন্তু পুরুষদের পাশাপাশি গোপনে রোমান সভ্যতার যাত্রাপথের রূপ নির্ধারণ করেছেন রোমান নারীরাও। যারা শুধু শাসকই ছিলেন না। ছিলেন নিষ্ঠুরও। আজ চারুলতায় জেনে নেব ইতিহাসের সেই সব নিষ্ঠুর কিছু নারী শাসকদের আদ্যোপান্ত। বিস্তারিত জানাচ্ছেন – অনিন্দ্য তাওহীদ
– মেসসেলিনাখারাপ চরিত্রের বা নিকৃষ্টতম নারীর কথা বলতে গিয়ে নিজেদের লেখনিতে রোমান লিখিয়েরা মেসসেলিনা শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কে এই মেসসেলিনা? আর কেউ নয়, রোমান শাসক ক্লদিয়াসের স্ত্রী। কথিত আছে, রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম নিকৃষ্ট আর ঘৃণ্য চরিত্রের রমণী ছিলেন মেসসেলিনা। একইসঙ্গে ২৫ জন পুরুষের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে জড়ান তিনি একই সময়ে। তাও শুধু প্রতিযোগিতায় জিতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই কথাগুলোর বেশিরভাগটাই গুজব। কেন গুজবগুলো ছড়ানো হয়? কারণ রাজা কালিগুলার মৃত্যুর পর মাথামোটা ক্লদিয়াসকে অনেকটা জোর করেই সিংহাসনে বসায় ক্ষমতালোভী মানুষেরা নিজেদের স্বার্থ বুঝে নিতে। আর তাদের এ পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় মেসসেলিনা। স্বামীকে সিংহাসনে বসিয়ে তার পেছন থেকে কলকাঠি নাড়তে থাকেন তিনি আর একে একে সবাইকে পর্যুদস্ত করতে থাকেন। তার বিরুদ্ধে কেউ একটা বাজে কথা বললেও সেই মানুষটির কারাবাস বা মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফেলতেন মেসসেলিনা মিথ্যে অভিযোগে। পরবর্তীতে অবশ্য অন্য একজনকে বিয়ে করেন মেসসেলিনা আর ক্লদিয়াসকে মেরে ফেলতে উদ্যত হন। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে অবশেষে তাকেই পরাজয় মেনে নিতে হয়। আর শেষমেষ মেসসেলিনাকে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। ফলে তার এ নিষ্ঠুর শাসনকালের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে।

অ্যাগ্রিপ্পিনা
মেসসেলিনার মৃত্যুর পর ক্লদিয়াস আবার বিয়ে করেন। এবার তার আত্মীয় অ্যাগ্রিপ্পিনাকে। আর নতুন স্ত্রীর দ্বারা আগের চাইতে আরও দ্রুত প্রভাবিত হন ক্লদিয়াস। অ্যাগ্রিপ্পিনার আগের ঘরের ছেলে নিরোকে ক্লদিয়াস তার নিজের ছেলে ব্রিটানিক্কাসের ওপরে স্থান দেন। সিংহাসন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। এর সবটাই অ্যাগ্রিপ্পিনার প্রভাবে। ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের নথিপত্র দেখা, দূতদের সঙ্গে কথা বলা থেকে রাষ্ট্রীয় সব কাজ করতে শুরু করেন অ্যাগ্রিপ্পিনা। তার ক্ষমতা পৌঁছে যায় অনেক উপরে। একটা সময় ক্লদিয়াসের চাহিদা ফুরোলে মাশরুমের তরকারিতে বিষ মিশিয়ে স্বামীকে মারার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ক্লদিয়াস প্রচণ্ড ডায়রিয়ার কারণে সেবার বেঁচে যায়। অবশ্য তাতেও রেহাই পায়নি বেচারা। ডাক্তারের মাধ্যমে আবার বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলেন অ্যাগ্রিপ্পিনা ক্লদিয়াসকে। ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হন অ্যাগ্রিপ্পিনার আগের ঘরের ছেলে নিরো।

পোপায়ে সাবিনা
অ্যাগ্রিপ্পিনা ছেলে নিরোকে সবসময় ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলেন। তাই নিরোর বিয়ে তিনি দিয়েছিলেন মেসসেলিনা আর ক্লদিয়াসের মেয়ে অক্টাভিনার সঙ্গে। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে নিরো ভালোবেসে ফেলে আরেক নারী পোপায়ে সাবিনাকে। সাবিনার ইচ্ছে ছিল নিরোকে বিয়ে করে ক্ষমতালাভের। কিন্তু অ্যাগ্রিপ্পিনা বেঁচে থাকতে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই নিরোকে সাবিনা তার নিজের মাকে খুন করতে বলে। মা আর প্রেমিকার মধ্য থেকে নিরো বেছে নেয় প্রেমিকাকেই। একটি নৌকায় মাকে উঠিয়ে সেটা ভাঙার বন্দোবস্ত করে। তবে কোনোক্রমে সাঁতরে বেঁচে যান অ্যাগ্রিপ্পিনা আর জানতে পারেন ছেলের ষড়যন্ত্র। সোজা গিয়ে নিজেকে আঘাত করতে বলেন তিনি। অবশেষে নিজের ছেলের হাতেই তার জীবনের অধ্যায় শেষ হয়।

জুলিয়া ডোমনা
অনেক দিন ভাটার পর আবারও সেভেরেন রাজত্বের সময় নারীরা আবার ফিরে আসে রোমে রাজ্যের শাসন কাজে। এর শুরুটা করেন শাসক সেপ্টিমিয়াস সেভেরাসের বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ও স্ত্রী জুলিয়া ডোমনা। সেপ্টিমিয়াসের মৃত্যুর পর সরাসরি শাসন কাজে অবতীর্ণ হন ডোমনা। এ সময় তার দুই ছেলে গেতা ও কারাকাল্লা সাহায্য করে তাকে। এ সময় রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে ডোমনার যথেষ্ট চেষ্টার পরেও দুর্ভাগ্য তার পরিবারের পিছু ছাড়েনি। ডোমনার ছেলে কারাকাল্লার হাতে খুন হয় আরেক ছেলে গেতা। এরপর ম্যাক্রিনাস নামক এক ব্যক্তির হাতে মারা যান কারাকাল্লাও। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন ডোমনা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ডোমনাও ছিল অনেক নিষ্ঠুর শাসক।

জুলিয়া সোআয়েমিয়াস
কারাকাল্লাকে হত্যার পর ম্যাক্রিনাস বেশ শান্তির একটা নিশ্বাস ফেলে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেভেরেন নারীদের ঠিক চিনতে পারেননি তিনি। জুলিয়া ডোমনার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এ সময় ম্যাক্রিনাসের পেছনে আদা-জল খেয়ে লেগে পড়েন ডোমনার বোন জুলিয়া মায়েসা এবং তার মেয়ে জুলিয়া সোআয়েমিয়াস। সোআয়েমিয়াসের ছেলে ইগাবালুসকে ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করেন তারা। যদিও শাসক হবার যোগ্যতা ছিল না, তবুও মাত্র ১৪ বছর বয়সে ম্যাক্রিনাসের ফাঁসির মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় বসেন ইগাবালুস। আর তার পেছন থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়েন সোআয়েমিয়াস এবং মায়েসা।

জুলিয়া মামায়েআ
ক্ষমতায় আসবার পর ইগাবালুস অনেকটা মায়েসার কথার বিপক্ষে চলা শুরু করেন। ফলে একটা সময় অ্যালেক্সান্ডার নামক একজনকে ক্ষমতায় আনেন মায়েসা। আর এই কাজটি করার জন্য মেয়ে আর নাতিকে হত্যা করেন তিনি। এই নতুন শাসক ছিলেন মায়েসার দ্বিতীয় কন্যা মামায়েআর সন্তান। অ্যালেক্সান্ডার ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের ভেতরেই মারা যান মায়েসা। এরপর ছেলের পেছন থেকে পুরো ক্ষমতার ব্যবহার করেন মামায়েআ। শুধু সিনেটই নয়, সামরিক বাহিনীতেও অংশ নেন এই নারী। পরে অবশ্য যুদ্ধে হেরে যান তারা। সৈন্যদের রোষের মুখে পড়েন। সৈনিকরা মা এবং ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করে। এভাবেই শেষ হয়ে যায় সেভেরেন রাজত্বের।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ