ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭শে জুন, ২০১৯ ইং, ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
basic-bank
শিরোনাম :
«» বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী লীগের বিশেষ প্রকাশনা বই প্রদান «» দেবহাটায় ছাত্রলীগের দুই গ্রæপের মধ্যে সংঘর্ষ ধাওয়া-পালটা ধাওয়া: আহত-২ «» ঝিনাইদহে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী «» হিন্দু ধর্মীয় প্রাইভেট শিক্ষককে গ্রেফতার «» ঝিনাইদহে শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে করনীয় বিষয়ক উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালা «» কুড়িগ্রামে মাদক ও পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত «» দিনাজপুরে স্তন ও জরায়ূ ক্যান্সার বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত «» হাবিপ্রবি’তে ভিশন ও মিশন চূড়ান্তকরণ বিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত «» দিনাজপুরে মাদক নির্মুলের জন্য প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সচেতনতা জাগ্রত করতে হবে «» ফুলবাড়ী পুলিশের হাতে ৭৫ পিচ ফেন্সিডিল সহ আটক ২

বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরি প্রসঙ্গে

ফরিদা ইয়াসমিন : মনিরা বেগম মিনু বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের অফিসের কক্ষে বসে মাঝে মাঝে দৃষ্টি চলে যায় এক চিলতে সবুজ মাঠের কোণে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ভাস্কর্যটির দিকে। মাঝে মাঝেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। কী তেজ, কী সাহস ছিল এই নারীর! সমাজের কঠিন কঠিন শৃঙ্খল কতই না কঠিন যুদ্ধ করে ভেঙেছেন। কত সহন শীলতা, সহ্য শক্তি দেখিয়েছেন নারী জাগরণের এই অগ্রদূত।
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ভাস্কর্যের নিচ দিয়েই চলাচল করে রোকেয়া হলের মেয়েরা। চিলমারী থেকে চট্টগ্রাম বা দেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এই মেয়েরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে। মেধা ও যোগ্যতা এদের মূল সম্পদ। এদের মধ্যে আছে দূর পাহাড়ের আদিবাসী, সুবিধা বঞ্চিত অনগ্রসর অঞ্চলের সদ্য কলেজ পারকরা সংকোচে ম্রিয়মাণ তরুণী, আবার শহুরে আধুনিকাও। ওরা দৃপ্ত পায়ে হাঁটে। ওদের প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন দিনের আত্মবিশ্বাস।
বেগম রোকেয়া তার ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কুসুমের সৌকুমার্য, চন্দ্রের চন্দ্রিকা, মধুর মাধুরী, যূথিকার সৌরভ, সুপ্তির নীরবতা, ভূধরের অচলতা, নবনীর কোমলতা, সলিলের তরুলতা এক কথায় বিশ্বজগতের সমুদয় সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতা লইয়া বাঙালি গঠিত হইয়াছে। আমাদের নামটি যেমন শ্রুতিমধুর, তদ্রূপ আমাদের সমুদয় ক্রিয়াকলাপ ও সহজ ও সরল। এখানে বাঙালি বলতে তিনি নারীদেরই বুঝিয়েছিলেন। শত বছর আগের প্রেক্ষাপটে বেগম রোকেয়ার এই বর্ণনার সঙ্গে খুব একটা দ্বিমত করার সুযোগ নেই। তবে সময় গড়িয়েছে। বেগম রোকেয়া যে বীজ বুনেছিলেন, তা আজ সুবিশাল মহিরুহ। আমাদের এই মেয়েরা আজ চন্দ্রের চন্দ্রিকা বটে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সুপ্তির নীরবতা নয়। তারা সলিলের তরল তাবটে, কিন্তু প্রয়োজনে তারাও হতে পারে সুনামির প্রবল ঢেউ। তারা এখনও নবনীর কোমলতা, কিন্তু তারা অবশ্যই নির্যাতন প্রতিরোধ করতে শক্ত হতে পারে। মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে মাথা উঁচু করে। আত্মপ্রত্যয়ী এই মেয়েগুলোকে দেখে গর্ব বেড়ে যায়। এদের প্রত্যেকেরই আছে শৃঙ্খল ভাঙার অনবদ্য সব কাহিনী। যেগুলোর দু-একটা জানার পর মনের অজান্তেই বের হয়ে আসে, কী করে পারলে! কোথায় পেলে এত সাহস! নিশ্চয় বেগম রোকেয়া ও অনুভব করেন মেয়েদের এই অগ্রগতি, যাদের চোখে-মুখে স্বপ্ন অপার।
শত বছর আগে এমন স্বপ্ন ছিল বেগম রোকেয়ার। সে স্বপ্ন তিনি বর্ণনা করে ছিলেন সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে। আধিপত্য বাদী, পরাক্রম শালী এই সমাজের বিপরীতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এক নারী স্থানের, যেখানে নারীর অধিকার ছিল সুনিশ্চিত। সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থে বেগম রোকেয়া তুলে ধরেছিলেন সেই সময়ের কঠিন চিত্র। সুলতানার ওই জগতের সারথি সারাকে তিনি বলছেন, ‘জানেন ভগিনী সারা, সামাজিক বিধি ব্যবস্থার প্রতি আমার হাত নাই। ভারতে পুরুষজাতি প্রভু, তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধাও প্রভুত্ব আপনাদের জন্য হস্ত গত করিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর-রূপ পিঞ্জরে আবদ্ধ রাখিয়াছে। উড়িতে শিখিবার পূর্বেই আমাদের ডানা কাটিয়া দেয়া হয় তদ্ব্যতীত সামাজিক রীতিনীতির কতশত কঠিন শৃঙ্খল পদে পদে জড়াইয়া আছে।’
শত বছর আগে বেগম রোকেয়া এই সমাজে নারীদের চারপাশে যে শৃঙ্খল দেখেছিলেন তা আজও কি বিদ্যমান নয়? হ্যাঁ, বর্তমানে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারীরা যে এগিয়েছে, তা স্বীকার করতে কার্পণ্য নেই। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেতা নারী, স্পিকার নারী, অন্যতম বৃহত্ রাজনৈতিক দলের নেতা নারী, নারীরা বিচারপতি হচ্ছেন, উড়োজাহাজ চালনা করছেন, মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন, আরও কত কিছুই না করছেন তারা। কিন্তু এগুলোই কি সব? এসব উদাহরণ কি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নারীদের উচ্চ স্থান নিশ্চিত করে? অন্যান্য দেশের তুলনায় এই দেশের  নারীরা কি খুব একটা এগিয়েছে? বর্তমান সময়ের নারীদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন কি বন্ধ হয়েছে? আজও কি এই সমাজে নারীদের সমম র্যাদায় দেখা হয়? বেগম রোকেয়ার জন্মদিনে আজ এই প্রশ্নগুলো নিয়েই আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতার অবসান ঘটাতে হবে। তার অগ্র গতির পথ সুগম করার উদ্যোগ নিতে হবে। নানা ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতনের বাস্তবতায় এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে। বেগম রোকেয়ার রংপুর বা অনগ্রসর উত্তরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে নারীরা আজও কত শৃঙ্খলিত, কত অবহেলিত তা মাঝে মাঝে জানা যায়।
নারীদের অগ্রযাত্রার পেছনে প্রকৃত পক্ষে কার্যকর বাধা কারা? নারীদের অধিকার আদায়ে প্রধান অন্তরায় কী? এ বিষয়ে বিস্তারিত বলে গেছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, যা আজকের বাস্তবতায় প্রণিধানযোগ্য। নারীদের এই অবস্থানের জন্য তিনি প্রথমে দায়ী করেছেন নারীদেরই। বেগম রোকেয়া ‘স্ত্রী জাতির অবনতিতে লিখেছেন, ‘আমাদের আত্মদর লোপ পাওয়ায় আমরাও অনুগ্রহ গ্রহণে আর সংকোচ বোধ করি না। সুতরাং আমরা আলস্যের প্রকারান্তরে পুরুষের দাসী হইয়াছি। ক্রমশ আমাদের মন পর্যন্ত দাস হইয়া গিয়াছে এবং আমরা বহুকাল হইতে দাসী পনা করিতে করিতে দাসত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। এই রূপে আমাদের স্বাবলম্বন, সাহস প্রভৃতি মানসিক উচ্চবৃত্তিগুলো অনুশীলন অভাবে বারবার অঙ্কুরে বিনাশ হওয়ায় এখন আর বোধ হয় অঙ্কুরিতও হয় না। ‘সত্যিই তো তাই, নারী হোক বা পুরুষ, অধিকার আদায় করা সহজ কাজ নয়। দরকার সংকল্প, প্রত্যয়, পরিশ্রম আর শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার প্রবল ইচ্ছা। যার মাধ্যমে হিমালয়কে পদানত করা সম্ভব। বেগম রোকেয়ার উত্তরসূরি ওয়াসফিয়া নাজরীন ও নিশাত মজুমদার এরই মধ্যে এভারেস্টের চূড়া জয় করেছেন। আগামী দিনের প্রবল চ্যালেঞ্জের জন্য ও প্রস্তুত হচ্ছে রোকেয়ার মেয়েরা। রোকেয়া দিবসে বাংলাদেশের সব রোকেয়া বলীয়ান হোক আত্মবিশ্বাসে। মেধা আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে ছিনিয়ে আনুক সফলতা, আলোকিত করুক নিজের জীবন ও সমাজকে। তাহলেই এক দিন বাস্তবে ধরা দেবে সুলতানার স্বপ্ন।
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।
ঘোষনাঃ